আমন মৌসুমে দেশের কৃষকদের কাছ থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন ধান এবং ৫ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই সংগ্রহ কার্যক্রমে প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৫ টাকা, সিদ্ধ চালের দাম ৪৯ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা যাতে উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পান এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বজায় থাকে, সে লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আমন মৌসুমে মোট ৮ লাখ ৫০ হাজার টন সংগ্রহের লক্ষ্য
রোববার (৮ নভেম্বর) ঢাকায় খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (FPMC) সভায় আমন মৌসুমের খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সভা শেষে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩ লাখ মেট্রিক টন আমন ধান, ৫ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে। সব মিলিয়ে ধান ও চাল সংগ্রহের মোট লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।
ধান ও চালের সরকারি সংগ্রহমূল্য কত?
আমন মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার জন্য প্রতি কেজি ৩৫ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার। অন্যদিকে, প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের সংগ্রহমূল্য ৪৯ টাকা এবং আতপ চালের সংগ্রহমূল্য ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্ধারিত সংগ্রহমূল্য অনুযায়ী কৃষকরা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারবেন। চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট চালকল মালিক ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে চাল কেনা হবে।
কবে থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু হবে?
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমন ধান সংগ্রহ শুরু হবে ১৪ নভেম্বর ২০২৬ থেকে। অন্যদিকে, চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে ১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে।
ধান ও চাল সংগ্রহের উভয় কার্যক্রম চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রার বেশি ধান কেনারও প্রস্তুতি
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছেন, সরকার প্রাথমিকভাবে ৩ লাখ মেট্রিক টন আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে কোনো কৃষক অতিরিক্ত ধান সরকারের কাছে বিক্রি করতে চাইলে তা কেনার ব্যবস্থা রাখা হবে।
অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে কোনো কৃষককে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কৃষক ধান বিক্রি করতে এলে তা কেনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন।
সরকারের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও সরকারি খাদ্য মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাও এই সংগ্রহ কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য।
গত মৌসুমের তুলনায় ধান ও চালের দামে পরিবর্তন
গত আমন মৌসুমের তুলনায় এবার ধানের সরকারি সংগ্রহমূল্য প্রতি কেজিতে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সিদ্ধ চালের সংগ্রহমূল্য আগের তুলনায় কেজিতে ১ টাকা কমিয়ে ৪৯ টাকা করা হয়েছে। আতপ চালের দামও কেজিতে ১ টাকা কমিয়ে ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের নির্ধারিত এই মূল্য কৃষক, চালকল মালিক এবং খাদ্যশস্য বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধানের সংগ্রহমূল্য বাড়ানোর ফলে কৃষকরা উৎপাদিত ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগ
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকার নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ করে। এতে একদিকে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের জন্য সরকারি বাজার তৈরি হয়, অন্যদিকে সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
আমন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন মৌসুম। এ মৌসুমে উৎপাদিত ধান দেশের চালের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামে ধান সংগ্রহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চাল মজুত করা খাদ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতি, কৃষকের স্বার্থ, উৎপাদন খরচ, বাজার পরিস্থিতি এবং সরকারি খাদ্য মজুতের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে আমন মৌসুমের সংগ্রহ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
কৃষকদের জন্য সিদ্ধান্তটির গুরুত্ব
আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনের পর কৃষকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করা। অনেক সময় বাজারে ধানের দাম উৎপাদন খরচের তুলনায় কমে গেলে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ পরিস্থিতিতে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম কৃষকদের জন্য একটি বিকল্প বিক্রির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে সংগ্রহ কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে পরিচালনা, প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা এবং নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করা গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়ন হলে কৃষক ও দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা উভয়ই উপকৃত হতে পারে।
এক নজরে আমন মৌসুমের সরকারি সংগ্রহ পরিকল্পনা
- ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা: ৩ লাখ মেট্রিক টন।
- সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা: ৫ লাখ মেট্রিক টন।
- আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা: ৫০ হাজার মেট্রিক টন।
- মোট সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা: ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।
- প্রতি কেজি ধানের দাম: ৩৫ টাকা।
- প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের দাম: ৪৯ টাকা।
- প্রতি কেজি আতপ চালের দাম: ৪৮ টাকা।
- ধান সংগ্রহ শুরু: ১৪ নভেম্বর ২০২৬।
- চাল সংগ্রহ শুরু: ১ ডিসেম্বর ২০২৬।
- সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭।
শেষ কথা
আমন মৌসুমে ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগ্রহের সরকারি সিদ্ধান্ত কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং খাদ্য মজুত শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে প্রকৃত কৃষকরা যাতে সহজে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে ধান এবং ১ ডিসেম্বর থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হলে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) এবং The Business Standard ।
প্রতিবেদন: NSNewsBD ডেস্ক