BREAKING NEWS
সর্বশেষ খবর লোড হচ্ছে...
বিষয়ভিত্তিক সংবাদ

২৯টি বাওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়াতে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার প্রকল্প

বাংলাদেশের ২৯টি বাওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার ২৯টি বাওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়াতে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার একটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে এসব জলাশয়ে মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন, দেশীয় মাছের প্রজনন এবং জলাশয়ের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে।

চার জেলার ২৯টি বাওড় প্রকল্পের আওতায়

মৎস্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত ‘নির্বাচিত বাওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের আওতায় যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ২৯টি বাওড় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পাঁচ বছর মেয়াদি এই উদ্যোগের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে জলাশয়গুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাওড় খনন ও মাছের অভয়াশ্রম তৈরি

প্রস্তাবিত প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বাওড়ের নির্বাচিত অংশ খনন করা। এ কাজে ১১ কোটি ২২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। খননের মাধ্যমে জলাশয়ের গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এতে শুষ্ক মৌসুমেও মাছের বসবাস ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনেক বাওড় দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে অগভীর হয়ে পড়েছে। ফলে মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

এ ছাড়া ২৯টি বাওড়েই মাছের অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে দেশীয় মাছ স্বাভাবিকভাবে প্রজনন ও বংশবিস্তার করতে পারে।

পোনা উৎপাদন ও মাছ অবমুক্ত করার পরিকল্পনা

মাছের উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান ৩৫টি মাছের পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পাশাপাশি পাঁচ বছরে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনের জন্য ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং নির্ধারিত জলাশয়ে কার্প ও দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করার জন্য ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে জলাশয়ে মাছের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণেও সহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

পানি সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়ন

প্রকল্পে বাওড় এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া মৎস্য খামারের যান্ত্রিকীকরণের জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং জরাজীর্ণ ছয়টি বাওড় ব্যবস্থাপনা কার্যালয় পুনর্নির্মাণের জন্য প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, পোনা সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করা হবে

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা তৈরি করা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ১৯৯০-এর দশকে গঠিত অনেক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্য তালিকা দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ করা হয়নি।

ফলে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সমিতির সদস্য তালিকা যাচাই ও হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এতে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা জলাশয়ের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং প্রকল্পের সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্ষায় আশপাশের জলাশয়েও মাছ ধরার সুযোগ

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত জলাশয়গুলোতে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হবে। সেখানে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ দিতে মাছ ধরা সীমিত রাখা হবে।

বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয়ের মাছ আশপাশের নদী ও বিলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন স্থানীয় জেলেরা আশপাশের জলাশয়ে মাছ ধরার সুযোগ পাবেন। এভাবে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

১৫ বছর পর নতুন উদ্যোগ

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর বাওড়ভিত্তিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে এ ধরনের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে প্রকল্পটি নিয়ে কাজ শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটি নীতিগত অনুমোদন পায়। জনবল কাঠামো অনুমোদনের পর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

তবে প্রকল্পের ব্যয় ও বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের প্রক্রিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তাই চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সময়সূচি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।

মৎস্য উৎপাদন ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের আশা

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক জানিয়েছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বাওড়গুলো পুনরুদ্ধার এবং দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন, দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে জলাশয় ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করা হচ্ছে।

এক নজরে প্রস্তাবিত প্রকল্প

  • প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয়: ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
  • মেয়াদ: পাঁচ বছর।
  • জলাশয়ের সংখ্যা: ২৯টি বাওড়।
  • জেলা: যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া।
  • মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য: অন্তত ১০ শতাংশ।
  • বাওড় খননের প্রস্তাবিত বরাদ্দ: ১১ কোটি ২২ লাখ টাকা।
  • মাছের অভয়াশ্রম স্থাপনের প্রস্তাবিত বরাদ্দ: ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
  • পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কার: ৩৫টি।
  • বিল নার্সারি স্থাপনের পরিকল্পনা: ২৯০টি।
  • প্রকল্পের অবস্থা: প্রস্তাবিত; মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া বাকি।

শেষ কথা

দেশের ২৯টি বাওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রস্তাবিত ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে চূড়ান্ত অনুমোদন, সঠিক বাস্তবায়ন, প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ এবং জলাশয়ের টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) এবং The Business Standard ।

প্রতিবেদন: NSNewsBD ডেস্ক